
অনার্য মুর্শিদ

নৈতিক ও রাজনৈতিক সাহিত্য
বিশ শতকের মধ্যভাগে বাংলা সাহিত্য যখন একদিকে নন্দনতত্ত্বের আত্মমগ্নতায়, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক ও রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের চাপে বিভক্ত, তখন সত্যেন সেন ইতিহাস, বিজ্ঞান ও রাজনীতিকে সাহিত্যের ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক ভিন্ন পথ বেছে নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য হবে জ্ঞান ও চেতনার বাহন—ক্ষমতাহীন মানুষের হাতে আত্মপরিচয়ের অস্ত্র।
Post Views: 7 অনার্য মুর্শিদ সত্যেন সেনের সাহিত্যে নৈতিকতা কোনো বিমূর্ত আদর্শ বা উপদেশমূলক নীতিবাক্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরই একটি কার্যকর রূপ। তাঁর কাছে নৈতিকতা মানে ব্যক্তিগত সদ্গুণ নয়, বরং ইতিহাস, জ্ঞান ও ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দায়বদ্ধ সম্পর্ক। মসলার যুদ্ধ, আল বেরুনী কিংবা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা—এই সব রচনায় তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস বিকৃতি,…
সত্যেন সেনের সাহিত্যে নৈতিকতা কোনো বিমূর্ত আদর্শ বা উপদেশমূলক নীতিবাক্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরই একটি কার্যকর রূপ। তাঁর কাছে নৈতিকতা মানে ব্যক্তিগত সদ্গুণ নয়, বরং ইতিহাস, জ্ঞান ও ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দায়বদ্ধ সম্পর্ক। মসলার যুদ্ধ, আল বেরুনী কিংবা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা—এই সব রচনায় তিনি দেখিয়েছেন, ইতিহাস বিকৃতি, সাম্প্রদায়িকতা ও বিজ্ঞানবিরোধী চিন্তা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল নয়, নৈতিক অপরাধও।
লেখা ছিল সত্যেন সেনের কাছে রাজনৈতিক দায়িত্ব। তিনি কখনোই নিজেকে ‘নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক’ হিসেবে করেননি। যা–ই লিখতেন, লক্ষ্য ছিল পাঠককে সচেতন নাগরিকে রূপান্তরিত করা। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পরবর্তী সময়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
সত্যেন সেনের রাজনৈতিক দর্শনকে কোনো একক
তাত্ত্বিক সূত্রে আবদ্ধ করা কঠিন। এটি গড়ে উঠেছে
মার্ক্সবাদী ইতিহাসবোধ, বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদ, অসাম্প্রদায়িক
মানবতাবাদ ও উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক চেতনার সম্মিলনে।
তাঁর মার্ক্সবাদী অবস্থান ছিল বিশ্লেষণী, গোঁড়ামুক্ত। তাঁর কাছে
মার্ক্সবাদ কোনো চূড়ান্ত মতাদর্শ নয়; বরং সমাজের শ্রেণিকাঠামো,
উৎপাদন সম্পর্ক ও ক্ষমতার বিন্যাস বোঝার একটি কার্যকর পদ্ধতি।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু।
বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ইতিহাস
রাজনৈতিক দর্শনের সাহিত্যিক রূপায়ণে সত্যেন সেন সচেতনভাবে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যকে বেছে নিয়েছেন। তাঁর কাছে ঔপনিবেশিকতা ছিল শুধু রাজনৈতিক শাসন নয়, বরং জ্ঞান, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণ। এই নিয়ন্ত্রণের ফলে শোষিত মানুষের ইতিহাস মুছে যায় বা বিকৃত হয়, যাকে তিনি ঔপনিবেশিক সমাজের প্রধান সংকট হিসেবে দেখেছেন। তাই তিনি ইতিহাসকে শাসকের নয়, শোষিত মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে পাঠ করতে চেয়েছেন। এই লক্ষ্যেই তাঁর সাহিত্যিক প্রকল্পের কেন্দ্রে ছিল ইতিহাস, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতা।
জেডি বার্নালের ‘সায়েন্স ইন হিস্ট্রি’ অবলম্বনে লেখা ‘ইতিহাস ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থে সত্যেন দেখিয়েছেন, ইতিহাসচর্চা যদি যুক্তি, প্রমাণ ও কার্যকারণ সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তবে তা সহজেই শাসকশ্রেণির মতাদর্শে পরিণত হয়। এখানে বিজ্ঞান বলতে তিনি কেবল প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বোঝাননি; বরং সমাজকে বোঝার একটি সামগ্রিক যুক্তিবাদী পদ্ধতির কথা বলেছেন। এই বিজ্ঞানমনস্ক ইতিহাসবোধই তাঁকে ইতিহাস বিকৃতি, অলৌকিক ব্যাখ্যা ও আবেগনির্ভর জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সাহায্য করেছে।
এই দৃষ্টিভঙ্গির জনপ্রিয় ও গণমুখী প্রকাশ দেখা যায় তাঁর বিজ্ঞানভিত্তিক ও প্রবন্ধধর্মী রচনাগুলোতেও। ‘আমাদের এই পৃথিবী’ গ্রন্থে তিনি প্রকৃতি ও পৃথিবী সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন, যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল কুসংস্কার ও ভয় ভাঙা। সত্যেন সেন বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞানমনস্কতা ছাড়া সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। এই গ্রন্থে বিজ্ঞান কেবল তথ্য নয়, এটি হয়ে ওঠে গণমানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতির হাতিয়ার।
ইহুদি জাতির পতনের সময়ের জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে রচিত সত্যেন সেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘অভিশপ্ত নগরী’, যা তৎকালীন রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও সমাজের গভীর দ্বন্দ্ব এবং ধর্মের অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেক এবং যুক্তির বিদ্রোহ তুলে ধরেছে।
‘মসলার যুদ্ধ’ উপন্যাসে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে অর্থনৈতিক লোভ, সামরিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য একত্রে কাজ করে বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
ইহুদি জাতির পতনের সময়ের জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে রচিত সত্যেন সেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘অভিশপ্ত নগরী’, যা তৎকালীন রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও সমাজের গভীর দ্বন্দ্ব এবং ধর্মের অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেক এবং যুক্তির বিদ্রোহ তুলে ধরেছে। যেখানে নবী ইয়ারমিয়ার প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে মানবপ্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর ‘পাপের সন্তান’ অভিশপ্ত নগরী উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড বলা চলে। প্রথম খণ্ডে যে অভিশপ্ত জেরুজালেম নগরীর কথা বলা হয়েছে, দ্বিতীয় খণ্ডে সেই নগরীটি পুনর্গঠনের কাহিনি ফুটে উঠলেও তাকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে মানবপ্রেম। এখানেও সত্যেনকে আমরা আবিষ্কার করি একজন যুক্তিবাদী হিসেবে, মানুষের ইতিহাসের লেখক হিসেবে, কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় ইতিহাসের লেখক হিসেবে নয়।
বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিতে রাজনৈতিক ইতিহাস

সত্যেন সেন যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ধর্ম ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ধর্ম যখন ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই তা শোষণের উপকরণে পরিণত হয়। তবে এই সমালোচনা কখনোই ধর্মবিদ্বেষী নয়; বরং ঐতিহাসিক ও সামাজিক বিশ্লেষণনির্ভর। ‘আল বেরুনী’ উপন্যাসে তিনি মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভেতরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের শক্তিশালী ধারা তুলে ধরেছেন। আল বেরুনীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে সত্যেন সেন দেখান, সভ্যতার অগ্রগতি কখনো একক ধর্ম বা জাতির একচেটিয়া সম্পদ নয়; বরং তা গড়ে ওঠে সংলাপ, কৌতূহল ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে। এ উপস্থাপন আধুনিক সাম্প্রদায়িক ইতিহাস বয়ানের সরলীকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা সত্যেন সেনের রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক স্তম্ভ। আগেও উল্লেখ করেছি, তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িকতা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের একটি কৌশল, যা শোষিত জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করে শাসনকে সহজ করে। তাই ‘ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ গ্রন্থে তিনি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করেন, যাঁরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। এভাবে তিনি ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন থেকে উদ্ধার করে শ্রেণি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে পুনঃ স্থাপন করেন।
‘আল বেরুনী’ উপন্যাসে মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভেতরে যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের শক্তিশালী ধারা তুলে ধরেছেন। আল বেরুনীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখান, সভ্যতার অগ্রগতি গড়ে ওঠে সংলাপ, কৌতূহল ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে।
সত্যেন সেনের মতে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও যদি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসচর্চায় ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি বহাল থাকে, তবে মুক্তি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
সত্যেন সেনের রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর ‘ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ গ্রন্থে। এখানে সত্যেন সেন পরিকল্পিতভাবে সেই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার বিরোধিতা করেন, যা মুসলমান সমাজকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে বন্দী করে দেখে। তিনি দেখান, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুসলমান জনগোষ্ঠী ছিল সক্রিয়, সংগ্রামী ও শ্রেণিগতভাবে বহুবিধ। এ গ্রন্থ কেবল ইতিহাসের পুনর্লিখন নয়, এটি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক অবস্থান।
একইভাবে ‘মসলার যুদ্ধ’ বা ‘আল বেরুনী’র মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসেও সত্যেন সেন ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন, জ্ঞান-দখল এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাঠামো উন্মোচন করেন। তাঁর ইতিহাসচর্চা কখনোই নিরপেক্ষতার ভান করেনি; বরং সচেতনভাবেই শোষিত মানুষের পক্ষ নিয়েছে। এ পক্ষাবলম্বনই তাঁকে মার্ক্সবাদী মানবতাবাদের ধারায় স্থাপন করে, যেখানে ইতিহাস মানে ক্ষমতার পালাবদল নয়; বরং মানুষের মুক্তির সংগ্রাম।
উদীচী প্রতিষ্ঠায় সত্যেন সেন
সত্যেন সেনের চিন্তা ও কর্মজীবন কেবল লেখালেখির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক দর্শন ও সাহিত্যিক চেতনা বাস্তব সমাজে কার্যকর না হলে তার মূল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি মনে করতেন, রাজনীতি যদি কেবল দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে না। সংস্কৃতিই সেই ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হয় এবং যেখানে চিন্তা ও অনুভূতির পরিবর্তন সম্ভব হয়। এই উপলব্ধি থেকেই উদীচী গড়ে ওঠে একটি গণসংস্কৃতির আন্দোলন হিসেবে। পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন রণেশ দাশগুপ্ত ও শহীদুল্লা কায়সারসহ সে সময়ের একঝাঁক তরুণ। যাঁরা অনুজ হলেও স্বয়ং সত্যেন সেন এবং উদীচীর তৈরিতে তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।

Leave a Reply