Press ESC to close

বেলুচিস্তান কি আরেক বাংলাদেশ হবে? ।। পূর্ণিমা চৌহান

পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তান আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক অভিযান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অঞ্চলটিকে নতুন করে সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জুনে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন জেলায় সেনাবাহিনীর অভিযানে বহু বেলুচ যোদ্ধা নিহত হওয়ার পাশাপাশি ডুক্কির কয়লা খনিতে হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য শ্রমিক। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত সমন্বিত হামলা ও পাল্টা অভিযানে শতাধিক মানুষের মৃত্যু পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন ক্রমশ উচ্চারিত হচ্ছে-দশকের পর দশক ধরে স্বাধীনতা দাবি করে আসা বেলুচিস্তান কি পাকিস্তানের জন্য আরেকটি বাংলাদেশে পরিণত হতে যাচ্ছে? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করেছিল। আজ বেলুচিস্তানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের বৈষম্য, সম্পদের অসম বণ্টন, রাজনৈতিক অধিকারহীনতা এবং সামরিকীকরণের অভিযোগ সামনে আসছে। যদিও দুই অঞ্চলের বাস্তবতা এক নয়, তবুও কিছু ঐতিহাসিক সাদৃশ্য পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, ইসলামাবাদ কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি ইতিহাস আবারও নতুন রূপে ফিরে আসবে?

কেন বৈষম্য, বঞ্চনা ও ক্ষোভ?

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ, যার আয়তন দেশটির মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৩ শতাংশ। অথচ জনসংখ্যার দিক থেকে এটি সবচেয়ে কম জনবহুল অঞ্চল। প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ সম্পদ, সমুদ্রবন্দর এবং কৌশলগত অবস্থানের কারণে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু স্থানীয় জনগণের অভিযোগ, এই সম্পদের সুফল তারা কখনোই পায়নি।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং উন্নয়ন বৈষম্য জনগণের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বেলুচদের দাবি, তাদের সম্পদ ব্যবহার করে পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চল উন্নত হয়েছে, কিন্তু বেলুচিস্তান নিজেই থেকে গেছে অবহেলিত। বিশেষ চীনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বেলুচিস্তানে চলছে নারকীয় তাণ্ডব।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানেও একই ধরনের অভিযোগ ছিল। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট এবং কেন্দ্রীয় শাসনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বাঙালিদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। বেলুচিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মিল খুঁজে পান অনেক বিশ্লেষক।

গোয়াদার বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে উন্নয়নকে অনেকেই নিজেদের জন্য সুযোগ নয়, বরং নতুন বঞ্চনার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।

সামরিক সমাধানের সীমাবদ্ধতা

বেলুচিস্তানের সংকট মোকাবিলায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান, ব্যাপক নিরাপত্তা মোতায়েন এবং কঠোর দমননীতি পরিস্থিতিকে শান্ত করার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আরও জটিল করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইতিহাস বলে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দাবিকে নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করে দমনমূলক নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যার ফল হয়েছিল বিপর্যয়কর। বেলুচিস্তানেও নিখোঁজ ব্যক্তি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্থানীয় জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

২০০৯ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি বেলুচদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন কিছু সশস্ত্র সংগঠনও সহিংসতা কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু সেনা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সরকারও মূলত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতির ওপর জোর দিচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া শুধু সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং এতে বিচ্ছিন্নতার মনোভাব আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বেলুচিস্তান কি সত্যিই বাংলাদেশের পথ অনুসরণ করবে?

বেলুচিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাসের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পেছনে ছিল সুসংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণভিত্তিক আন্দোলন এবং একটি সুস্পষ্ট জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন। শেখ মুজিবুর রহমানের মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব পুরো জাতিকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিল।

বেলুচিস্তানে এখনো তেমন সর্বজনগ্রাহ্য নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। বিভিন্ন আদিবাসী, রাজনৈতিক দল এবং সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে বিভাজন রয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিও বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাকিস্তান, চীন, ইরান এবং আফগানিস্তানের কৌশলগত স্বার্থ এ অঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—বৈষম্য, দমননীতি এবং রাজনৈতিক অধিকারহীনতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে বেলুচিস্তানে অসন্তোষ আরও বাড়বে। ইতিহাস দেখিয়েছে, জনগণের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে উপেক্ষা করলে সংকট আরও গভীর হয়। পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা। সংলাপ, অংশীদারিত্ব, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা ছাড়া অন্য কোনো পথ দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

বেলুচিস্তান আগামীকাল স্বাধীন রাষ্ট্র হবে-এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অঞ্চলটির জনগণের ক্ষোভ এবং বঞ্চনার অনুভূতি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পাকিস্তান যদি এই সংকেতগুলোকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যাবে। আর সেই কারণেই প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক—বেলুচিস্তান কি আরেক বাংলাদেশ হবে, নাকি পাকিস্তান এবার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে?

পূর্ণিমা চৌহান: সংবাদকর্মী। সাফ-মদনজিৎ সিং স্কলার, এশিয়ান কলেজ অব জার্নালিজম।