Press ESC to close

অজ্ঞানের পুনরাবর্তন ।। সলিমুল্লাহ খান

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যখন রক্ত দিয়েই চিন্তা করতে বাধ্য হচ্ছি। চারদিকে এতো অন্যায়, অবিচার এতো মূঢ়তা এবং কাপুরুষতা ওঁৎ পেতে আছে যে এ ধরনের পরিবেশে নিতান্ত সহজে বোঝা যায় এমন সহজ কথাও চেঁচিয়ে না বললে কেউ কানে তোলে না।

—আহমদ ছফা (১৯৭২)

পরলোকগত পুরুষ পুরুষানুক্রমের নামযশ জীবিতের মগজে দুঃস্বপ্নের নাহান চাপিয়া থাকে।

—কার্ল মার্কস (১৮৫২)

পরের পঞ্চাশ বছরেও বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করিতে পারে নাই। যে উন্নতির দোহাই সে দিয়াছিল তাহা বৈষম্যের উত্তাপে কর্পূরের মতন উড়িয়া গিয়াছে। গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে ঝুলাইয়া সে ফ্যাসিতন্ত্র কায়েম করিয়াছিল। বড় বড় স্বাধীনতার বুলি আওড়াইয়া সে নতুন পরাধীনতার শিকল হাতে ও পায়ে জড়াইয়াছে। যে ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সে একদা তাহার সাধের পাকিস্তান ভাঙিয়া দিয়াছিল সেই ভাষাকে আজ সে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার আবডালে বিসর্জন দিতেছে। ১৯৪৭ সালে যে ট্রাজেডির জন্ম ১৯৭১ সালের পর ক্রমেই তাহা প্রহসনে পরিণতি মানিয়াছে।


২০২৪ সালের রক্তস্রোত প্রমাণ করিয়াছে মানুষ নিছক প্রাকৃতিক প্রাণী নয়। মানুষের মন ইতিহাসের সৃষ্টি, তাহার অগণন অভিজ্ঞতার পরিণতি। এই অভিজ্ঞতা শুদ্ধ ২০২৪ সালে সীমিত ছিল ভাবিলে অনেক বড় ভুলের পুনরাবর্তন ঘটিবে। মনে রাখিতে হইবে, শুদ্ধ ১৯৭১ সালের নয়, ১৯৪৭ সালের, এমনকি ১৯০৫ সালের বাসনা হইতেও ২০২৪ সালের গণতন্ত্র প্রাণ সংগ্রহ করিয়াছে। মজার ব্যাপার, আমরা এই সত্য সবসময় জানি না। শুদ্ধ সংকটের মুহূর্তে এই সত্য ঝিলিক দিয়া ওঠে। মহাত্মা ফ্রয়েডের আবিষ্কার অনুসারে এই ঝিলিককে ‘অজ্ঞান’ বলা হইয়া থাকে।
ইতিহাসে এমন সময়ও আসে যখন সংস্কৃতির সংগঠন রাজনীতির আকার ধারণ করে: সকল সার্থক বিপ্লবের আগে সংস্কৃতির সংগঠন সরব হয়, বৈপ্লবিক চিন্তার প্রবাহ কলকল ধ্বনি উচ্চারণ করিতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১৭৮৯ সালের ফরাশি বিপ্লব প্রাণ পাইয়াছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর ‘জ্ঞানের আলো’ আন্দোলন হইতে। এই আন্দোলন সারা এয়ুরোপ মহাদেশে একটা সার্বজনীন বিশ্ববিবেক জাগাইয়াছিল, সংগঠিত করিয়াছিল একটা ‘বুর্জোয়া আন্তর্জাতিক’। মহাদেশ ব্যাপিয়া বিস্তীর্ণ দুর্গতি ও বঞ্চনার অবসান আর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বুর্জোয়া দাবি সর্বসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া দেওয়ার কাজ ছিল ‘জ্ঞানের আলো’ নামধারী বুদ্ধিজীবীদের কীর্তি। একই উদাহরণের পুনরাবর্তন দুনিয়ার দেশে দেশে, রুশ, তুরস্ক, চীন, কুবা কি ভিয়েতনাম, সব দেশেই ঘটিয়াছে। এখন প্রশ্ন হাজির: দুই হাজার চব্বিশের পর আর কি আছে?
২০২৪ সালের গণজাগরণ বাংলাদেশে জবরদস্তি চাপিয়া থাকা একটা সরকার হটাইয়া দিয়াছিল কিন্তু তাহার স্থলে বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করিতে পারে নাই। অগণ্য দেওয়াল লিখন হইতেও অনুমান করা যায়, এই গণজাগরণ বিপ্লবের মতন উচ্চাভিলাষ পোষণ করে নাই। তাহার সজ্ঞান ধ্বনি ছিল, ‘স্বাধীনতা আনিয়াছি, সংস্কারও আনিব।’ দুঃখের মধ্যে কিছু কম দুই বছর স্থিত অন্তর্বর্তী সরকারও কোন স্থায়ী সংস্কার প্রবর্তনের চেষ্টা করেন নাই। দেড় বছরের মাথায় সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করাই সম্ভবত অন্তর্বর্তী সরকারের একমাত্র কৃতিত্ব বলিয়া কীর্তিত হইবে। মাঝখানে বাধা থাকিলে এক বিন্দু হইতে আর বিন্দু যাইবার পথ একটি বক্ররেখা বৈকি! বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্তর্বর্তী সরকার একটা বক্ররেখার অধিক নয়।
শেষ পর্যন্ত কি হইবে বলি কি করিয়া! তবে এই পর্যন্ত যাহা হইল তাহার তুলনা নাই। রাজকাহিনীতে যাহার নাম ‘জনসাধারণের সার্বভৌমত্ব’ ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশের জনসাধারণ তাহার পুনরাবর্তন করিয়াছে। এখন বাংলাদেশ কি আমূল বা অপূর্ব পরিবর্তনের পথে হাঁটার চেষ্টা করিবে? নিষ্ক্রিয় থাকিলে বা উল্টাদিকে চলিলে ট্রাজেডির পুনরাবর্তন কি প্রহসনের পথ এড়ান কঠিন হইবে। স্পেনদেশের কবি আন্তনিয়ো মাচাদো একদা ঠিকই লিখিয়াছিলেন: ‘পথ বলিয়া কিছু নাই, পথিক! সমুদ্রে ভাসে শুদ্ধ জাহাজের ঢেউ।’ পরিবর্তনের পথ আগে হইতেই কাটা থাকে না। অতএব মাচাদোর পদটি আরেকবার আওড়াইয়া এই নাতিদীর্ঘ বিবৃতির পরিসংহার করা যায়।

হাঁটিতে হাঁটিতে পথ কাটিতেছ তুমি
যে পথে হাঁটিয়া আসিলে
সে পথে ফিরিবে না আর
পথ বলিয়া কিছু নাই, পথিক!
সমুদ্রে ভাসে শুদ্ধ জাহাজের ঢেউ।